পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করায় বিভিন্ন জেলা ও মিল থেকে রাজধানী ঢাকায় ডিম, মুরগি, সবজি, চিনি আটা, তেলসহ অন্যান্য পণ্যভর্তি ট্রাক আসতে শুরু করেছে। তারপরও সরবরাহ সংকট কাটেনি। সবজির দাম কমলেও ডিম, মুরগি, আটা, চিনি, ডাল, চালসহ নিত্যপণ্যের বাজার চড়া রয়েছে।
সহিংসতা থেকে জানমাল রক্ষার জন্য সরকার গত শুক্রবার রাত থেকে সারাদেশে কারফিউ জারি করে। কেনাকাটা ও জরুরি কাজের সুবিধার্থে প্রতিদিন নির্দিষ্ট একটি সময় কারফিউ শিথিল করা হয়। এ সময় বেচাকেনা বেড়ে যায়। এ সুযোগে যে যার মতো দাম আদায় করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
রাজধানীর টাউন হল বাজারে ২০০ টাকা কেজি পোলট্রি মুরগি বিক্রি হলেও হাতিরপুল বাজারে তা ২২০ টাকা। কারওয়ান বাজারে ২০০ টাকা কেজির কাঁচা মরিচ হাতিরপুল বাজারে ২৬০ টাকা। এভাবে একই পণ্য বাজারভেদে ২০ থেকে ৬০ টাকা পর্যন্ত ব্যবধানে বিক্রি হচ্ছে। এতে ভোক্তাদের মধ্যে চরম ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। তারা বলছেন, এভাবে আর চলা যায় না। গতকাল হাতিরপুল, কারওয়ান বাজার, টাউন হল বাজার ঘুরে সংশ্লিষ্ট ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
টাউন হল বাজারের সোনালি ব্রয়লার হাউসের বিক্রয়কর্মী কামাল জানান, পরিস্থিতি ভালোর দিকে। মাল এসেছে। ব্রয়লার ২০০ টাকা কেজি ও সোনালি মুরগি ৩২০ টাকা কেজিতে বিক্রি করা হচ্ছে। তবে কারওয়ান বাজারে আরো কম দামে বিক্রি করা হচ্ছে। শ্রীপুর ব্রয়লার হাউসের সলিমুল্লাহ বলেন, ব্রয়লার ১৮৫-১৯০ টাকা ও সোনালি মুরগির কেজি ২৯০-৩০০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। কিন্তু সেই ব্রয়লারই হাতিরপুল বাজারের খুচরা বিক্রেতারা ব্রয়লার ২২০ টাকা কেজি ও সোনালি মুরগি ৩০০-৩২০ টাকা কেজিতে বিক্রি করছেন। তেজগাঁও ডিম ব্যবসায়ী সমিতির সাবেক সভাপতি আমান উল্লাহ বলেন, ডিমের সরবরাহ বেড়েছে। ১০০ ডিম ১ হাজার ১১০ টাকায় বা ১৩৩ টাকায় ডজন বিক্রি করা হচ্ছে। টাউন হল বাজার ও কারওয়ান বাজারে ১৫০-১৫৫ টাকায় বিক্রি হলেও হাতিরপুল বাজারে ১৬০ টাকায় ডজন বিক্রি করতে দেখা যায়। বিভিন্ন পাড়া-মহল্লাতেও আগের চেয়ে দাম কমেছে।
কারওয়ান বাজারের বিক্রেতারা জানান, সরকার ছাত্রদের দাবি মেনে নেয়ায় ও কারফিউ জারি করায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসছে। গতকাল এই বাজারে পণ্যভর্তি বহু ট্রাক এসেছে। এজন্য এক দিনের ব্যবধানে প্রায় সব সবজির দাম কেজিতে ২০-৩০ টাকা কমেছে। গাজর ও টমেটো ছাড়া সব সবজি ১০০ টাকার নিচে নেমেছে। বেগুন, করলা ছাড়া অধিকাংশ সবজি ৫০-৭০ টাকা কেজিতে বিক্রি করা হয় বলে খুচরা বিক্রেতারা জানান। সবজি বিক্রেতা সুমন জানান, বেগুন ৮০-৯০ টাকা, করলা ৭০-৮০ টাকা, ঢ্যাঁড়শ ও পটোল ৫০-৬০ টাকা, শসা ৬০ টাকা, কচুরমুখী ৮০-৯০ টাকা, লাউ ও চাল কুমড়া ৭০-৮০ টাকা পিস। মরিচের দামও কমেছে। তা ২০০ টাকায় নেমেছে।
তবে অন্য বাজারে এসব পণ্য কেজিতে ১০-২০ টাকা বেশি বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। হাতিরপুল বাজারে বেগুন ৯০-১০০ টাকা কেজি, কাঁচা মরিচ ২৬০ টাকা, বরবটি ৮০ টাকা, করলা ১০০ টাকা, ঢ্যাঁড়শ ৮০ টাকা ও পটোল ৮০ টাকা, পেঁপে ৫০-৬০ টাকা, ঝিঙ্গা, ধুন্দল ৮০ টাকা, কাঁকরোল ১০০ টাকা, কচুরমুখী ১০০ টাকা, টমেটো ও গাজর ২৪০ টাকা কেজি। পুঁইশাকের আঁটি ৪০-৫০ টাকা, লালশাক, পালংশাক ও পাটশাকের আঁটি ২০ টাকা করে বিক্রি করেন খুচরা বিক্রেতারা। টাউন হল বাজারে বিভিন্ন সবজি বেশি দামে বিক্রি হতে দেখা গেছে।
কারওয়ান বাজারসহ বিভিন্ন বাজারে পেঁয়াজ ১১৫-১২০ টাকা, আলু ৬০ টাকা, আদা ২৮০-৩০০ টাকা, রসুন ২০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হতে দেখা গেছে। পাইকারি পর্যায়ে পেঁয়াজের দাম আরো কম বলে বিক্রেতারা জানান। মিনহাজ বাণিজ্যালয়ের খলিল জানান, জ্বালাও-পোড়াওয়ের পর গতকাল একসঙ্গে অনেক ট্রাক ঢুকেছে। দামও কমেছে। ১০৪-১০৬ টাকা কেজি ফরিদপুরের পেঁয়াজ। আর মাতৃভাণ্ডারের কালাম শেখ জানান, পাবনার পেঁয়াজ ১১২ টাকা কেজি। পাড়া-মহল্লাতেও গতকাল আগের চেয়ে কম দামে ভ্যানে করে বিভিন্ন সবজি বিক্রি করতে দেখা গেছে।
বাংলাদেশ কাঁচামাল আড়ত মালিক সমিতির সভাপতি মো. ইমরান মাস্টার বলেন, বিভিন্ন স্থানে জ্বালাও-পোড়াও হয়েছে কয়েক দিন ধরে। তবে সরকার দাবি মেনে নেয়ায় সরবরাহ বেড়েছে। পরিস্থিতি আরো স্বাভাবিক হলে সরবরাহ আরো বাড়বে। তখন দাম কমে যাবে।
কারওয়ান বাজারের খুচরা বিক্রেতা আলী স্টোরের আলী হোসেনসহ অন্য খুচরা বিক্রেতারা বলেন, সহিংসতার কারণে কয়েক দিন কোনো গাড়ি আসেনি। মজুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। এজন্য পামতেল লিটারে বেড়েছে ১৬ টাকা। মসুর ডাল বস্তায় বেড়েছে ২০০ টাকা। এছাড়া আটা ২০০, চিনি ৪০০, চাল ৫০-১০০ টাকা বেড়েছে বস্তায়। তবে সরবরাহ বাড়লে আবার কমে যাবে। মিল থেকে পণ্য সরবরাহের ব্যাপারে সিটি গ্রুপের পরিচালক বিশ্বজিৎ সাহা বলেন, আগের চেয়ে পরিস্থিতি অনেক স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। গতকাল মিল থেকে মালামাল (চিনি, আটা, চাল) বাজারে যাওয়া শুরু হয়েছে। কোনো জিনিসের দাম বাড়ানো হয়নি। আগের মতোই সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য রয়েছে।