
মাত্র দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আওতায় ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পরিবার ও তার বোন শেখ রেহানার পরিবারের বিরুদ্ধে ১৫টির বেশি মামলা দায়ের হয়েছে। এর মধ্যে ক্ষমতার প্রভাব দেখিয়ে রাজধানীর পূর্বাচলে ৬০ কাঠা প্লট বরাদ্দ নেওয়ার অভিযোগে চার্জশিট দাখিল হয়েছে। সাক্ষ্যগ্রহণ ও বাদীর জেরা শেষ পর্যায়, ফলে খুব শিগগিরই মামলার রায় হতে পারে বলে জানা গেছে।
এক বছরের ব্যবধানে শেখ পরিবারে বিরুদ্ধে প্লট, সেতুর টোল, সূচনা ফাউন্ডেশন, সিআরআইর অনুদান ও অবৈধ সম্পদের হাজার কোটি টাকার মামলার তদন্ত চলমান রয়েছে।
শেখ হাসিনা ও তার পরিবার সংশ্লিষ্ট মামলার তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে জানতে চাইলে দুদকের মহাপরিচালক মো. আক্তার হোসেন ঢাকা পোস্টকে বলেন, দুদক নির্দিষ্ট কোনো বিষয় বা ব্যক্তির দুর্নীতি নিয়ে কাজ করে না। দুদক আইন ও বিধি অনুসরণ করে তফসিলভুক্ত সব দুর্নীতির বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেয়। এক্ষেত্রেও দুদকের তদন্ত কর্মকর্তারা আইন ও বিধির মধ্যে থেকে তাদের তদন্তকাজ শেষ করবে। পরে আইনি পদক্ষেপ আদালত নেবে।
শেখ হাসিনাসহ পরিবার সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির যত মামলা-
পূর্বাচলে ৬০ কাঠা প্লট নিয়ে আসামি শেখ পরিবার
রাজধানীর পূর্বাচলে ৬০ কাঠা প্লট বরাদ্দ নেওয়ার প্রমাণ পাওয়ায় ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, মেয়ে পুতুল ও তার বোন শেখ রেহানার পরিবারে সদস্য, সাবেক প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদ, প্রধানমন্ত্রীর সাবেক একান্ত সচিব সালাউদ্দিন এবং জাতীয় গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের ১৪ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পৃথক ৮ অভিযোগপত্র বা চার্জশিট দাখিল করে দুদক। এর মধ্যে নিজ নামে পূর্বাচল আবাসন প্রকল্পের ২৭ নম্বর সেক্টরের ২০৩ নম্বর রাস্তার ৯ নম্বর প্লট নেওয়ার অভিযোগ শেখ হাসিনাসহ ১২ জনকে আসামি করে চার্জশিট দেওয়া হয় গত ১০ মার্চ। সব মামলা বর্তমানে বিচারাধীন পর্যায়ে রয়েছে। চলতি বছরেও রায় হওয়ার সম্ভবনা রয়েছে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
গত ১২, ১৩ ও ১৪ জানুয়ারি তাদের বিরুদ্ধে মামলাগুলো দায়ের করা হয়েছিল। আসামিদের বিরুদ্ধে সরকারের সর্বোচ্চ পদাধিকারী ও পাবলিক সার্ভেন্ট হিসেবে বহাল থাকাকালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের ওপর অর্পিত ক্ষমতার অপব্যবহার করে বরাদ্দ পাওয়ার যোগ্য না হওয়া সত্ত্বেও অসৎ উদ্দেশ্যে পূর্বাচল আবাসন প্রকল্পের ২৭ নম্বর সেক্টরের ২০৩ নম্বর রাস্তার ৬টি প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়। শেখ হাসিনাসহ তার পরিবারের ছয় সদস্যের বিরুদ্ধে পূর্বাচলে প্লট বরাদ্দে অনিয়মের অভিযোগ দুদক থেকে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত দেওয়ার কথা গত ২৭ ডিসেম্বর জানিয়েছিল দুদক।
সেতুর টোলের ৩০৯ কোটি টাকা নয়-ছয়
মেঘনা-গোমতী সেতুর টোল আদায়ে কম্পিউটার নেটওয়ার্ক সিস্টেম লিমিটেডকে কাজ দিয়ে সরকারের প্রায় ৩০৯ কোটি ৪২ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতি সাধনের অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক মন্ত্রী কাদের ৭ মন্ত্রীসহ মোট ১৭ জনের বিরুদ্ধে গত ১২ অক্টোবর মামলা দায়ের করে দুদক। দুদকের ঢাকা সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে সংস্থাটির সহকারী তানজিল বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন।
এ মামলায় আসামিরা হলেন— সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, সাবেক স্থানীয় সরকার মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন, সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, সাবেক প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান, সাবেক সচিব এম এ এন ছিদ্দিক, সাবেক অতিরিক্ত সচিব মো. ফারুক জলিল, সাবেক উপসচিব মোহাম্মদ শফিকুল করিম, সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. ফিরোজ ইকবাল, সাবেক প্রধান প্রকৌশলী ইবনে আলম হাসান, সাবেক অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আফতাব হোসেন খান, সাবেক অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুস সালাম, সিএনএস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুনীর উজ জামান চৌধুরী, পরিচালক সেলিনা চৌধুরী ও পরিচালক ইকরাম ইকবাল।
হাসিনা-রেহানা পরিবারের দুর্নীতির অনুসন্ধান শুরু
মামলা এজাহারে বলা হয়, ২০১৬ সালে মেঘনা-গোমতী সেতুর টোল আদায়ে দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে কম্পিউটার নেটওয়ার্ক সিস্টেম লিমিটেডে একক উৎসভিত্তিক দরপত্রে নিয়োগ দিতে পূর্বের টেন্ডার বাতিল করা হয়। অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই শুধু সিএনএস লিমিটেডের সঙ্গে চুক্তি করে ৫ বছরের জন্য সার্ভিস চার্জ নির্ধারণ করা হয় মোট আদায় করা টোলের ১৭.৭৫ শতাংশ। এর ফলে সিএনএস লিমিটেড মোট ৪৮৯ কোটি ৪৩ লাখ ৭৩ হাজার টাকা বিল গ্রহণ করে, যা একই মেয়াদের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের তুলনায় অনেক বেশি।
সেতুতে ২০১০-২০১৫ এই ৫ বছরে MBEL-ATT এই দুটি কোম্পানিকে জয়েন্ট ভেঞার কম্পিউটারাইজড পদ্ধতিতে টোল আদায়ের ১৫ কোটি ৫৮ লাখ ৬৭ হাজার ৯১২ টাকায় নিয়োগ করা হয়। অথচ ২০২২-২০২৫ সালে মেঘনা-গোমতী সেতুতে ৩ বছরে ইউডিসি কনস্ট্রাকশন লিমিটেডকে ভ্যাট ও আইটিসহ ৬৭ কোটি ৫৪ লাখ ৯১ হাজার ৪৬৬ টাকায় নিয়োগ দেওয়া হয়। যা ৫ বছরে রূপান্তর করলে হয় ১১২ কোটি ৫৮ লাখ ১৯ হাজার ১১০ টাকা। অতএব এমন নিয়োগের ফলে সরকারের ক্ষতি হয়েছে ৩০৯ কোটি ৪২ লাখ ৪৫ হাজার ৮৯০ টাকা।